Tuesday, 23 June 2015 10:46

গণকৃষি কমিশনের প্রস্তাবনা: ভূমিহীনের খাসজমি প্রাপ্যতা ও টেকসই কৃষিতে প্রান্তিক কৃষকের অধিকার

গণমাধ্যমের বন্ধুগণ,

ইনসিডিন বাংলাদেশ-এর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা নিন। ইনসিডিন বাংলাদেশ একটি গবেষণাভিত্তিক সমাজ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান। বিশ্ব বাণিজ্য উদারীকরণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের জনস্বার্থ সুরক্ষার বিষয়ে ইনসিডিন বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। দেশের শিল্প ও সামাজিক খাতের উন্নয়নেও প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন রকম কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। 

আপনারা অবগত আছেন, ২০০৫ থেকে ২০১০ পর্যন্ত গণ কৃষি কমিশনের আওতায় ইনসিডিন বাংলাদেশ কৃষি গণশুনানীর মাধ্যমের প্রায় ২৫০০০ কৃষকের মতামত সংগ্রহ করেছে। এই গণ কৃষি কমিশনের সাথে মূল ধারার ও তৃণমূল পর্যায়ের ১৮টি কৃষক সংগঠণ সম্পৃক্ত ছিল। কৃষি ও কৃষকের- বিশেষত প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষায় ও টেকসই কৃষির স্বপক্ষে একটি নীতি প্রস্তাবনাও এই প্রক্রিয়ায় দাড় করানো হয়। সর্বসম্মত এই নীতি প্রস্তাবনায় বিভিন্ন সংগঠনের তৎকালীন নেতৃবৃন্দ স্বাক্ষর করেন; যেমন- মির্জা আব্দুল জলিল,সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষক লীগ; ফজলে হোসেন বাদশা, এমপি, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও  জাতীয় কৃষক সমিতি, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সভাপতি, জাতীয়তাবাদী কৃষক দল। জাতীয় কৃষি পর্যালোচনা কমিটি ও সংশ্লিষ্ট কৃষক সংগঠনসমূহের নেতৃত্বে পরিচালিত গণ কৃষি কমিশনের মাধ্যমে উঠে আসা প্রস্তাবনাসমূহ ২০১০ সাল থেকে আমরা  বিরামহীণভাবে সরকারের সামনে তুলে ধরছি। এক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতিও অর্জিত হয়েছে। আমরা আজকে আপনাদের বিবেচনার জন্য এই প্রস্তাবনার মূল কয়েকটি বিষয় তুলে ধরব। 

১) ভূমিহীন ও প্রান্তিক মানুষের স্বার্থ সুরক্ষার উপযোগী খাসজমি প্রাপ্যতা: সুপ্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ প্রথমেই আমরা ভূমিহীন ও প্রান্তিক মানুষের স্বার্থ সুরক্ষার উপযোগী খাসজমি প্রাপ্যতার বিষয়ে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি- ১) ভূমিহীনদের হাতে আবাসন ও কৃষি কাজের জন্য খাস জমি/জলা হস্তান্তর করা উচিৎ বিদ্যমান নীতি কাঠামোর মধ্যেই। অন্য কোন নীতির আওতায় কোন বিনিময় বা লীজ মূল্য প্রচলন করা অনুচিত। ২) খাসজমি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ভূমিহীন নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কার্যকর নীতি অনুসরণ করা জরুরী। এই নীতি বাস্তবায়নে বৃহত্তর বিবেচনায় উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নারীর সমতা নিশ্চিত করা যেমন সময়ের দাবী তেমনি কৃষি ক্ষেত্রে প্রান্তিক/ভূমিহীন নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণে কৃষি খাস জমি ব্যবস'াপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা (১৯৯৮)’তে প্রয়োজনীয় প্ররিবর্তন আনাও আজ সময়ের দাবী। মনে রাখতে হবে, ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিয়য়ক প্রতিষ্ঠান (এফ.এ.ও) ’এর হিসেব মতে বাংলাদেশে নারীর মালিকানাধীন কৃষি জমির পরিমাণ ছিল মাত্র ৩.৫ শতাংশ। প্রায় বিশ বছরে এই মালিকানা হ্রাস পেয়ে ২ শতাংশে নেমে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ৩) আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্যও খাসজমিতে থাকা প্রয়োজন অগ্রাধিকার। এক্ষেত্রে তাদের প্রথাগত ভূমি মালিকানা পদ্ধতির স্বীকৃতি ও আইনী সুরক্ষা প্রয়োজন । ৪) ব্যক্তি ভূমিহীন বা ভূমিহীন পরিবারের বদলে খাসজমি প্রকৃত ভূমিহীন সমবায় বা যৌথ সমিতিকে অগ্রাধিকার দেয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজন কার্যকর দিক নির্দেশনা। ৫) একইভাবে জলবায়ু অভিবাসীদের সম্ভাব্য ভূমি চাহিদা বিবেচনায় রেখে সরকার ভবিষ্যতদর্শী সুরক্ষা সেবা নিশ্চিত করবেন। আইপিসিসি’র প্রক্ষলণ অনুযায়ি বাংলাদেশে গঙ্গা-ব্রক্ষ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকায় প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস' হবে। ্‌অন্য গবেষণায়  (স্টেন, ২০০৭; সারওয়ার ও খান) বলা হচ্ছে, আমাদের সমুদ্র উপকূলের ১৮ শতাংশ ভূমি তলিয়ে যেতে পারে। আর একটি গবেষণা অনুযায়ি এরই মধ্যে ১০ লক্ষ মানুষ তাদের আবাস হারিয়েছেন এবং তাদের ৭০ শতাংশ ভূমিহীন হয়ে পরেছেন। ৬) রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকা কৃষি খাস জমি অন্য খাতে বা দেশীয় বা বহুজাতিক কর্পোরেশনের হাতে চলে যেন না যায় তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন আইনী কাঠামো। ৭) সরকারের কোন উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া কোন অবস'াতেই কোন ভূমিহীনকে খাস জমি থেকে উৎখাত করবে না- এমন নির্দেশনাও জরুরী। ৮) বন্টনকৃত ভূমির মান ও পরিমান হতে হবে  কৃষি জীবিকার উপযোগী। বাংলাদেশে ভূমিহীনতার মাত্রা ১২.৮৪ শতাংশ, যা ১৯৯৬ সালে ছিল ১০.১৮ শতাংশ, আর ১৯৮৩-৮৪ তে ছিল ৮.৬৭ শতাংশ (বি.বি.এস.)। বাংলাদেশে প্রায় ৩৩ লক্ষ একর খাস জমি রয়েছে। দেশের ভূমিহীন পরিবারগুলোর মধ্যে এই জমি, পরিবার-পিছু আধা একর বা ৫০ শতাংশ করে বিতরণ করা হলেও এই পরিবারগুলো দারিদ্র সীমার উপরে উঠে আসতে পারতো এবং টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করতে পারতো।

সাংবাদিক বন্ধুগণ, গণ কৃষি কমিশনের মতে- ভূমিহীনদের হাতে জমি হস্তান্তরই কেবলমাত্র সরকারের কাজ হবে না- হস্তান্তরিত খাস সম্পদ যেন কার্যকরভাবে কৃষিতে উৎপাদনশীল থাকে ও জমির মালিকানা বজায় থাকে তা নিশ্চিত করতেও সরকার বিবিধ পরিষেবা প্রদান করবে। এর আওতায় কারিগরী সহায়তা, স্বল্প সুদে মৌসুমী কৃষি ঋণ ও বাজার সহায়তা প্রভৃতি অন্তর্ভূক্ত থাকবে। এই লক্ষ্যে গণকৃষি কমিশনের কতিপয় সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা  আজকে আমরা তুলে ধরছি-

২) বাংলাদেশের খাদ্য ও কৃষক নিরাপত্তায় কৃষি ও শস্যবীমা প্রচলন সময়ের দাবী : সাংবাদিক বন্ধুগণ, সরকারি ও বেসরকারি সুনাম সম্পন্ন বীমা কোম্পানীগুলো শস্যবীমা কার্যক্রম চালু করতে পারে যেখানে সাধারন বীমা কর্পোরেশন পূনঃবীমার নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারে এবং বীমা অধিদপ্তর বীমা দাবী নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে প্রশাসনিক এবং মনিটরিং-এ দায়িত্ব পালন করতে পারে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, কৃষিবীমা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বীমা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারী বীমা খাত এবং এনজিওগুলোর মধ্যে অংশীদারিত্ব গুরুত্বপূর্ণ ও জোরালো ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে স'ানীয় পর্যায়ের কৃষকদের নিজস্ব সংগঠনের নজরদারি ছাড়া কৃষকের নাগালে কৃষিবীমা ব্যবস'া পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এককভাবে এনজিওরা কৃষক-বান্ধব ভূমিকা পালন করতে পারবে না। অর্থ অংকে হিসাব করলে দেখা যাবে সরকার দূর্যোগ পরবর্তী ত্রান পরিচালনায় যে ব্যয় করে তার তুলনায় কৃষিবীমা প্রবর্তনে কৃষক পর্যায়ে প্রদত্ত প্রিমিয়ামের অনুন্য ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারী ভর্তূকী প্রদানের ব্যয় অনেক বেশী কার্যকর ও দীর্ঘ-মেয়াদে লাভজনক। এছাড়া জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত অভিঘাত মোকাবেলার কর্মপরিকল্পনায় যে বৈশ্বিক সহায়তার অঙ্গীকার সরকার পেয়েছে তা থেকেও কৃষিবীমা তহবিল গড়ে তোলা সম্ভব বলে আমরা মনে করি। এটিও সরকারের উপর অর্থায়নের চাপ কমাবে। কৃষিবীমাকে দূর্যোগ ও জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত অভিঘাত মোকাবেলার কর্মপরিকল্পনা ও নীতির মূলধারায় স'ান দিতে হবে। এক্ষেত্রে ২০১৪ সালে জাপান সরকারের ২ মিলিন মার্কিন ডলার অনুদান ও বাংলাদেশ সরকারের ৪ লক্ষ্য ২০ হজার ডলারের অংশীদারিত্বে একটি পাইলট প্রকল্প (ডবধঃযবৎ ওহফবী নধংবফ ঈৎড়ঢ় ওহংঁৎধহপব) শুরুর কথা শোনা গেলেও এক্ষেত্রে কোন অগ্রগতির তথ্য আমাদের হাতে নেই।

৩) উন্নয়ন নীতির প্রেক্ষাপটে কৃষি খাস জমিসহ সকল কৃষি জমি সুরক্ষার সুস্পষ্ট নাগরিক প্রস্তাবনা: বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে মতে বাংলাদেশের মোট ভূমির পরিমাণ ৩ কোটি ৫৭ লাখ ৬৩ হাজার একর যার মধ্যে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ মাত্র ৮০ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। এর এক-চতুর্থাংশই এখন হুমকির মুখে। বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা গেছে, দিনে ২২০ হেক্টরের বেশি কৃষি জমি অকৃষি খাতে যাচ্ছে, বছরে কমছে ৮২ হাজার হেক্টর জমি, যা মোট জমির এক ভাগ। প্রতি বছর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে এক হাজার হেক্টর জমি। নির্মাণ কাজের কারণে বছরে বিলীন হচ্ছে তিন হাজার হেক্টর জমি। গত ৩৭ বছরে শুধু ঘরবাড়ি নির্মাণ হয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার একর জমিতে। সরকারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে ভূমিহীনতার মাত্রা ১২.৮৪ শতাংশ, যা ১৯৯৬ সালে ছিল ১০.১৮ শতাংশ, আর ১৯৮৩-৮৪ তে ছিল ৮.৬৭ শতাংশ। সরকারের নিজস্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠান মৃত্তিকা সমপদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) সমপ্রতি প্রকাশিত “বাংলাদেশের কৃষিজমি বিলুপ্তির প্রবণতা” শীর্ষক গবেষণা অনুয়ায়ী, ২০০০ সাল পরবর্তী ১২ বছরে দেশে প্রতিবছর ৬৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর আবাদি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। গবেষণা পত্রসমূহ থেকে আরও জানা যায় যে-গত ৩৮ বছরে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমেছে ১ দশমিক ২৪২ মিলিয়ন হেক্টর, প্রতিবছর দেশের ৬৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর চাষাবাদ যোগ্য জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতের এক গবেষণা অনুযায়ী  ১৯৭২-২০০৯ সাল পর্যন্ত: ২৬ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫৬ একর জমি অকৃষি খাতে চলে গেছে, ঘরবাড়ি নির্মাণ হয়েছে ৬৪ হাজার ৪৮৯ একর জমিতে, দোকান নির্মাণ হয়েছে ৬ হাজার ২৬২ একর জমিতে, কলকারখানা নির্মাণ হয়েছে ২২২ একর জমিতে, বিদ্যালয় দুই হাজার ৮২৭ একর, স্বাস'্যকেন্দ্র ৪৯৯ একর জমিতে এবং মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে এক হাজার ৯৯৯ একর জমিতে। এছাড়াও সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস'ার সম্প্রসারণ, পর্যটন ও বিনোদন অবকাঠামোর বিস্তার, সেনানিবাস স'াপন, জলাবদ্ধতা ও লবনাক্ততা প্রভৃতি কারণেও কৃষি জমির পরিমান কমে আসছে। 

গণ মাধ্যমের বন্ধুগণ,আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, ভুমি মন্ত্রণালয়  নাগরিকদের মতামত সংগ্রহে “কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন (খসড়া, ২০১৫) প্রকাশ করেছন। আমরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। কৃষিজমি অন্যখাতে ব্যবহার করতে হলে সরকারি অনুমোদনের বিধান থাকা স্বত্ত্বেও তা মানা হচ্ছে না। এছাড়াও জলাধার, বনভূমি ও পাহাড় সুরক্ষা আইন থাকলেও নেই তার যথাযথ প্রয়োগ। আমরা অনতিবিলম্বে কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ (বিশেষত প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকের স্বার্থ) মাথায় রেখে বহুপাক্ষিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই আইনকে চূড়ান্ত রূপদানের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। সরকার বর্তমানে বিভিন্ন নীতি (চূড়ান্ত বা খসড়া) প্রণয়নে হাত দিয়েছেন (যেমন চিংড়ি নীতি)- যেসব নীতি কৃষি জমি ও বিশেষত কৃষি খাসজমির উপর প্রভাব ফেলবে তার প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় কৃষক প্রতিনিধির (বিশেষত প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষক প্রতিনিধির) অংশগ্রহণ ও স্বার্থের প্রাধান্য দেওয়াও জরুরী হয়ে উঠেছে। কৃষক প্রতিনিধি ও কৃষক সংগঠনসমূহের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি গণমুখী কৃষি ভূমি সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা দেখেছি যে সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ই কোন না কোনভাবে কৃষি জমির অকৃষি ব্যবহারের সাথে যুক্ত বা তার উপকারভোগী  (যেমন ২০১৩ সালে- রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স'াপনের লক্ষ্যে ১৮৩৪ একর কৃষি জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে- যার মধ্যে আছে ১টি নদী, ১০টি খাল ও ৮৪ একর খাসজমি। ২০১৪ সালে উন্নয়ন কাজে মোট ৯৯০৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয় যা কৃষি ও বাস'ভিটা থেকে প্রায় ৭০০০ মানুষকে উচ্ছেদ করেছে)। এক্ষেত্রে আমরা প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের নীতিপত্রেই কৃষি জমি ও কৃষি খাস জমি সুরক্ষা সম্বন্ধে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা কামনা করছি। কৃষক, ক্ষেতমুজুর ও ভূমিহীন সংগঠনের সরকারি নিবন্ধন ও শ্রমিক ইউনিয়নের ন্যায় কাজের সুযোগ তৈরী ও  কাঠামো প্রণয়ন করা যেতে পারে। কৃষক, ক্ষেতমুজুর ও ভূমিহীন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ খাস জমিসহ কৃষি জমি সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো গড়ে তুলবে। খোদ কৃষকের হাতে জমি ও কৃষিজ সম্পদের যথাযথ হস্তান্তর ও কার্যকর কৃষি পরিষেবা গঠনের মাধ্যমে টেকসই কৃষি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ সাংগঠনিক কাঠামো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে। কৃষি ও পরিবেশ ধ্বংসকারী ইটেরভাটা, আবাসন ও শিল্প কলকারখানা গড়ে তোলার জন্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে কৃষি জমি ব্যবহারের রক্ষাকবচ ও কৃষি জমি, বিশেষত দুই ও তিন ফসলী জমিকে কখনই অকৃষিখাতে ব্যবহার না করার বিধিসহ কৃষি ভূমি সুরক্ষার কার্যকর নীতি ও আইনী কাঠামো প্রণয়নে ঐক্যবদ্ধভবে কৃষকের প্লাটফর্ম সরকারকে সহায়তা ও ভূমিকা পালন করতে আগ্রহী তাদেরকে এ পরিকল্পনায় যুক্ত করতে হবে। 

৪) কৃষি পণ্য পরিবহণের জন্য কম ভাড়ায় ‘কৃষি রেল’ ব্যবস'া একটি জনপ্রস্তাব: সাংবাদিক বন্ধুগণ; গণ কৃষি কমিশন তিনটি আশু করনীয় চিহ্নিত করেছে- ১) প্রতিটি কৃষি মৌসুমে ফসল উৎপাদন করে পরিবহণ বিড়ম্বনায় বিপাকে পড়া কৃষকদের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ও জরুরিভিত্তিতে বিনামূল্যে কৃষকের রেল চালু করার উদ্যোগ নেবেন। ২) এর আওতায় দেশব্যাপী চলাচলরত প্রতিটি লোকাল ট্রেনে প্রাথমিক পর্যায়ে-জরুরী ভিত্তিতে; কৃষকদের জন্য নির্ধারিত অতিরিক্ত কয়েকটি বগি/মালবাহী বগি (যা কৃষক ও তার পণ্য পরিবহণের উপযোগী) যুক্ত করে স্বল্প সময়ে ও ব্যায়ে এই মৌসুমেই কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়াবেন। ৩) পরীক্ষামূলক এই উদ্যোগের অভিজ্ঞতায় দেশব্যাপী একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষকবান্ধব রেল ব্যবস'া- ‘কৃষকের রেল’: গড়ে তুলবেন জরুরী ভিত্তিতে। এর পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ কৃষক বান্ধব রেল ব্যবস'ার আওতায় থাকবে: ক) বিনামূল্যে/স্বল্পমূল্যে ও কৃষকদের জন্য লাভজনক-মূল্যে কৃষক ও তার পণ্যের পরিবহণের দেশব্যাপী সুবিধা। খ) রেলষ্টেশন-ভিত্তিক কৃষকের বাজার, কৃষিপণ্যের গুদাম ও হিমাগার সুবিধা- যা ক্রমান্বয়ে রেল বিভাগকেও নতুন আয়ের পথ করে দেবে ও জনস্বার্থে নতুন ভূমিকা দেবে (যার উদাহরণ রয়েছে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশেই)।

৫) কৃষি আইন সংস্কার এবং কৃষি আদালত প্রবর্তনের প্রস্তাবনা: গণমাধ্যমের বন্ধুগণ; কৃষি উপকরণে ভেজাল প্রতিরোধে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট আইন ও সুস্পষ্ট নীতিমালা। কৃষি উপকরণে ভেজাল কৃষি উৎপাদনকে ব্যাহত করে দেশের খাদ্য উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটায়। দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকীর মুখে ফেলে দেয়। ফলে বিষয়টিকে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নকারী গুরুতর অপরাধ বলে বিবেচনা করে যথাযথ আইন প্রণয়ন ও তার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সাথে গণ কৃষি কমিশণের অভিমত- কৃষি সংক্রান্ত অপরাধসমূহ এবং সহজ নিষ্পত্তিযোগ্য ভূমি বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজন ‘শ্রম আদালতের’ আদলে একটি ‘কৃষি আদালত’ গঠন করা। এই আদালত কৃষি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ন্যায় বিচার প্রাপ্তি সহজতর করবে। কৃষি আদালত একটি নিয়মিত বিচারিক আদালত হিসেবে সংযুক্ত হতে পারে যেমন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালত গড়ে উঠেছে। কৃষি ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের অধিকারগুলোর আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কৃষি আদালত গঠনের বিষয়টি এখন সময়ের দাবীতে পরিণত হয়েছে। উল্লেখ্য গত সংসদের শেষ অধিবেশনে (অক্টোবর ২০১৩) মহাজোটের সাংসদ ওয়ার্কার্স পার্টির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা, এমপি -“কৃষি আদালত” সংক্রান্ত বিল উত্থাপন করেছেন। আমরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।

আমরা আশা করছি আপনাদের মাধ্যমে আমাদের প্রস্তাবনা মাননীয় আইনপ্রণেতা ও নীতি নির্ধারকগণের কাছে পৌছাবে এবং উক্ত বিষয়গুলো তাঁরা আন্তরিকতার সাথে বিবেচনা করে অবিলম্বে যথাযথ ও কার্যকর ব্যবস'া গ্রহণ করবেন।

 

মনোযোগ দিয়ে আমাদের বক্তব্য শোনার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।

 

 

এ.কে.এম. মাসুদ আলী

নির্বাহী পরিচালক

ইনসিডিন বাংলাদেশ

 

Last modified on Tuesday, 04 August 2015 10:54