Monday, 07 September 2015 22:08

কৃষি আদালতঃ ন্যায় বিচার ও কৃষি সম্পদে কৃষকের অধিকার

কৃষি আদালত: ন্যায় বিচার ও কৃষি সম্পদে কৃষকের অধিকার প্রসঙ্গে’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় আজ ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫, সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে। গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ইনসিডিন বাংলাদেশ আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক এ কে এম মাসুদ আলী। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জননেতা ফজলে হোসেন বাদশা, এমপি, বাংলাদেশ কৃষক লীগের সাধারন সম্পাদক এডভোকেট খন্দকার শামসূল হক রেজা, বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সাধারন সম্পাদক জায়েদ ইকবাল খান, লা ভিয়া ক্যাম্পেচিনার দক্ষিন এশিয়া সমন্বয়কারী বদরুল আলম, বাংলাদেশ ভূমিহীন সমিতির সাধারন সম্পাদক সুবল সরকার, জাতীয় কৃষক জোটের সাধারন সম্পাদক কামরুজ্জামান ফসি, সংযুক্ত কৃষক ও ক্ষেতমজুর ফেডারেশনের সাধারন সম্পাদক শাহজাহান কবির জহির, ইনসিডিন বাংলাদেশের প্রধান নীতি বিশ্লেষক এডভোকেট রফিকুল ইসলাম খান ও এডভোকেসী চিফ নাসিমুল আহসান। এছাড়াও বিভিন্ন কৃষক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে কৃষিক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও কৃষি সংক্রান্ত বিরোধসমূহের দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত নিষ্পত্তিকল্পে ‘কৃষি আদালত’ প্রতিষ্ঠার আহবান জানিয়ে কৃষি আদালত প্রতিষ্ঠায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। লিখিত বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক কৃষকদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথ সুগম করা এবং গণতন্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণে কৃষি আদালত প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরেন। এটিকে তিনি সরকাররে ২০২১’ এর উন্নয়ন দর্শন ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন।

সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে ভেজাল বীজ, সার, কীটনাশকসহ বিবিধ প্রকার ভেজাল কৃষি উপকরণ বাজারজাত করার মধ্যদিয়ে কৃষকদের ঠকানোর বিষয়টি উঠে এসেছে। ভেজাল বীজ শুধু কৃষককে আর্থিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করছেনা বরং পুরো মৌসুমের ফসল বিনাসের মাধ্যমে তাকে বছরব্যাপী খাদ্যাভাবের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এরফলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জাতীয় লক্ষ্যটিও ব্যাহত হচ্ছে। ভেজাল সার ও কীটনাশকের ক্ষেত্রেও একই ধরণের পরিণতি হচ্ছে। চুক্তিভিত্তিক চাষের ক্ষেত্রে মুল্য প্রতারণা, চুক্তিকৃত কৃষিপণ্য ক্রয়ে অস্বীকৃতি, সিন্ডিকেট করে কৃত্রিমভাবে কৃষিপণ্যের মূল্য কম দেওয়ার ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কৃষিজমি বর্গা, নগদ ভাড়ায় চাষ, মৌসুমী বন্ধক নেওয়া এবং কৃষিপণ্য মজুদে হীমাগার মালিকদের চুক্তিভঙ্গ ও প্রতারণার কারণে ভূমিহীন প্রান্তিক কৃষকের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে হরহামেশা। খাস জমিতে ভূমিদস্যু ও প্রভাবশালীদের অবৈধ দখলদারীর কারণে ভূমিহীন প্রান্তিক কৃষকরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাসজমিতে চাষাবাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই সকল কারণগুলো সার্বিকভাবে দেশের কৃষির উপর যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে তার ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির গতি মন'র হয়ে পড়ছে। এই সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করতে পারলে দেশের খাদ্যসহ সার্বিক কৃষি উৎপাদন আরও ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে বিভিন্ন কৃষিবীদ ও বিশেষজ্ঞের মতামতে উঠে এসেছে বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়। যুগোপযোগী আইনের অনুপসি'তি এবং বিচার কাজে আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা ক্ষুদ্র কৃষকদের আদালতে যাওয়া থেকে বিরত রাখে। ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত রাখে গ্রামীণ ক্ষুদ্র-প্রান্তিক কৃষক ও ভূমিহীন জনগোষ্ঠীকে। এই অবস্থার অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কৃষি আদালত স্থাপনের দাবিটিকে এই সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জনদাবি বলে উল্লেখ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে উপসি'ত জাতীয় কৃষক সমিতির সভাপতি ফজলে হোসেন বাদশা তার বক্তব্যে বলেন, কৃষি আদালতের ধারনাটি আমি অর্জন করেছি ইনসিডিন বাংলাদেশের কাছ থেকে। সেসময় আমার অঞ্চলের দুটি ইউনিয়নে কৃষকরা বহুজাতিক কোম্পানির ধানবীজ কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ব্যাপারে একজন কৃষক মামলা দায়ের করলে বহুজাতিক কোম্পানির স্থানীয় প্রতিনিধিরা এবং এমনকি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও তাকে মামলাটি তুলে নেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। শেষমেশ আদালতে মামলাটি খারিজ হয়ে যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ন্যায়বিচার বঞ্চিত হয়। এর পরপরই আমি ইনসিডিন বাংলাদেশের কৃষিনীতিপত্র উপস্থাপনায় কৃষি আদালতের বিষয়টি জানতে পারি এবং লুফে নিই। বিগত জাতীয় সংসদের শেষ সময়ে বিষয়টি আমি জাতীয় সংসদে উতথাপন এবং আলোচনা করি। মাননীয় কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী তখন আমার আলোচনাকে প্রশংসা করেছিলেন এবং বলেছিলেন কৃষি আদালতের ধারনাটি সারাদেশে না হলেও কয়েকটি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে চালু করে দেখা যেতে পারে। তবে এখন আর এ বিষয়টি নিয়ে কোন অগ্রগতি হচ্ছে না। আমি আপনাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি কৃষি আদালতের বিষয়টি আমি কৃষি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে উত্থাপন করবো এবং এ ব্যাপারে তাদের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহ্বান জানাবো। যদি তারা পদক্ষেপ নিতে কালক্ষেপণ করেন তাহলে আমি বেসরকারি বিল হিসেবে বর্তমান জাতীয় সংসদে বিষয়টি প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের জন্য উত্থাপন করবো।

বাংলাদেশ কৃষক লীগের সাধারন সম্পাদক এডভোকেট শামসুল হক রেজা বলেন, ‘কৃষি আদালত স্থাপনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে ন্যায়বিচার পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনন্য নজির স্থাপন করে গ্রামীণ জনগণের অধিকার সুরক্ষায় এশিয়ার কৃষি প্রধান দেশগুলোকে পথ দেখাবে বাংলাদেশ। দেশকে দারিদ্রমুক্ত একটি উন্নত দেশে পরিণত করার ক্ষেত্রে কৃষি আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগামী পদক্ষেপ বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

কৃষি আদালত প্রতিষ্ঠিত হলে নিচে বর্ণিত ইতিবাচক ফলাফলসমূহ অর্জিত হবে বলে বক্তারা মনে করেন-
• ভেজাল কৃষি উপকরণ তথা বীজ, সার, কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদন ও বিপণন বন্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস'া গ্রহণ করা সম্ভব হবে
• ভেজাল ও প্রতারণার শিকার কৃষকদের ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা বিধান করা যাবে
• ভেজাল উপকরণ ক্রয় করে প্রতারিত কৃষক আইনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার ও সহায়তা পাবে
• ভেজালকারীদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে কৃষি উপকরণে ভেজাল নিরোধ সম্ভব হবে
• কৃষি কেন্দ্রীক ভূমি বিরোধসমূহ দ্রুত নিষ্পত্তি হবে
• গ্রামাঞ্চলে কৃষি কেন্দ্রীক অপরাধ প্রবণতা (যেমন মহাজনদের মাপে গরমিল/হিমাগার মালিকদের চুক্তিভঙ্গ) কমবে
• তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত আইনের শাসন সুদৃঢ় হবে
• কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হবে
• গ্রামীণ কৃষিজীবি জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধি পাবে ও জীবিকা টেকসই হবে
• গ্রাম থেকে শহরমুখী দারিদ্র-প্রসূত-অভিবাসন প্রবণতা কমবে

 

বাংলাদেশে কৃষি আদালতের প্রতিষ্ঠা কৃষি প্রধান এশিয়ায় গ্রামীণ ও তৃণমূল পর্যায়ে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিক অবদান রাখবে এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকেও পথ দেখাবে বলে বক্তাগণ দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

Last modified on Thursday, 10 September 2015 16:21